গোধূলির আবছা আলোয় ব্রহ্মপুত্র নদের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা শশী লজ (Shoshi Lodge) যেন এক প্রাচীন সাক্ষী। ময়মনসিংহ শহরের এই রাজবাড়ির প্রতিটি লালচে ইটে জড়ানো আছে মুক্তাগাছার জমিদার বংশের উত্থান-পতনের এক দীর্ঘশ্বাস। মহারাজা শশীকান্ত আচার্য চৌধুরীর (Shashikanta Acharya Chowdhury) নামের সঙ্গে যুক্ত এই প্রাসাদ। স্থানীয়ভাবে এটি 'ময়মনসিংহ রাজবাড়ী' নামেও পরিচিত।

​ঊনবিংশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে মুক্তাগাছার জমিদার মহারাজ সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরী (Suryakanta Acharya Chowdhury) তাঁর দত্তক পুত্র শশীকান্তের নামানুসারে ৯ একর জমির ওপর প্রথমে এই দ্বিতল ভবনটি নির্মাণ করেন। কিন্তু, ১৮৯৭ সালের সেই ভয়াবহ ভূমিকম্পে প্রাসাদটি আংশিক বা পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়।

​দীর্ঘশ্বাস ফেলে শশীকান্ত আচার্য চৌধুরী হাল ছাড়েননি। ১৯০৫ থেকে ১৯১১ সালের মধ্যে তিনি প্রাসাদটি আবার নতুন করে নির্মাণ করেন, যা আজকের এই দৃষ্টিনন্দন শশী লজ। মূল ফটকে চোখ রাখলেই দেখা যায় ১৬টি বিশাল গম্বুজ, যা তার রাজকীয় ঐশ্বর্যের প্রতীক।

​কিন্তু এই গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে আছে অন্য কেউ। তিনি হলেন গ্রিক দেবী ভেনাস (Venus), যিনি কিনা শশী লজের মূল ভবনের সামনে চমৎকার বাগানের মাঝখানে শ্বেতপাথরের ফোয়ারার ওপর স্নানরত অবস্থায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।

​একদিন, রোদ ঝলমলে দুপুরে, শশীকান্ত দেখলেন তাঁর প্রিয় পুত্রবধূ সুরমা দেবী দেবীর মূর্তির দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে আছেন। সুরমা দেবী ছিলেন উদার মনের, শৈল্পিক রুচির মানুষ।

​"কী দেখছো সুরমা?" শশীকান্ত জিজ্ঞেস করলেন।

​সুরমা দেবী মৃদু হেসে বললেন, "এই দেবী ভেনাস। তিনি ভালোবাসার দেবী। কিন্তু এই শ্বেতশুভ্র মূর্তিটি যেন এক গভীর বিষণ্ণতা লুকিয়ে রেখেছে, মহারাজ। এত ঐশ্বর্য, এত স্থাপত্যের মাঝেও কেমন একটা শূন্যতা।"

​শশীকান্ত দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। এই প্রাসাদ নির্মাণে তিনি কোনো কার্পণ্য করেননি। মূল ভবনের ১৮টি বিশাল কক্ষের (eighteen large rooms) পাশাপাশি পেছনের দিকে তিনি নির্মাণ করিয়েছিলেন মার্বেল পাথরে বাঁধানো ঘাটসহ পুকুর এবং রানির জন্য দোতলা স্নানঘর (two-storied bathing house)। লোকমুখে প্রচলিত ছিল, সেই স্নানঘরের ভেতরে একটি সুড়ঙ্গপথ (tunnel) ছিল, যা মুক্তাগাছার রাজবাড়ি পর্যন্ত চলে গিয়েছিল। প্রাসাদের ভেতরে বসানো হয়েছিল প্যারিস থেকে আনা লক্ষাধিক টাকা মূল্যের স্ফটিকের তৈরি একটি 'মিউজিক্যাল বক্স', যা সিঁড়িতে কারো চলাচল অনুভব করলেই সুমধুর বাজনা বাজাতো!

​তবুও কোথাও যেন একটা বিষাদ ছিল।

​জমিদারি প্রথা শেষ হলো, কেটে গেল শতবর্ষ। শশী লজ হারালো তার রাজকীয় জৌলুস। ১৯৫২ সাল থেকে দীর্ঘদিন এটি মহিলা শিক্ষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (Women's Teachers' Training College) হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। একসময়ের নাচঘরে চলেছে শিক্ষকের প্রশিক্ষণ।

​বর্তমানে শশী লজ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের (Department of Archaeology) তত্ত্বাবধানে আছে, যারা ২০১৫ সালে এটি অধিগ্রহণ করে জাদুঘর (museum) স্থাপনের উদ্যোগ নেয়। এখন এর কয়েকটি কক্ষে রাখা আছে জমিদারদের ব্যবহৃত আসবাবপত্র, হাতির দাঁতের সোফা, মার্বেল পাথরের টেবিলসহ নানা প্রাচীন নিদর্শন।

​আজও হাজারো দর্শনার্থী আসেন শশী লজ দেখতে। যখন তারা মূল ফটকে ১৬ গম্বুজ পেরিয়ে প্রবেশ করে, তাদের চোখ আটকে যায় সামনের সেই সবুজ লনে। সেখানে, শ্বেতপাথরের ফোয়ারার মাঝখানে গ্রিক দেবী ভেনাস স্থির।

​দর্শনার্থীরা মুগ্ধ হয়, কিন্তু কেউ কি জানে—প্রতিটি গোধূলিতে, যখন দূর থেকে ভেসে আসে ব্রহ্মপুত্রের মৃদু সুর, তখন দেবীর শ্বেতপাথরের চোখে কি কোনো নীরব অশ্রু চিকচিক করে? সেই অশ্রু কি আজকের জাদুঘরের নির্জনতায় হারিয়ে যাওয়া এক রাজকীয় অতীত, নাকি কালের প্রবহমানতায় বদলে যাওয়া এক গৌরবময় ইতিহাসের প্রতিচ্ছবি? শশী লজ সেই গল্পটাই আজও নীরবে বলে যায়।